শান্তিপ্রিয় দেশ ওমান

এমএম রহমাতুল্লাহ: বিশ্বের অন্যতম শান্তিপ্রিয় দেশ ওমান। এদেশে অপরাধের মাত্রা প্রায় শূন্যের কোটায়। ওমানের রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বাংলাদেশের শ্রমশক্তির অন্যতম একটি দেশ ওমান। এখানে সারাবছর জুড়ে খুব গরম থাকলেও সমুদ্র তীরের জলবায়ু আদ্র। ওমানের প্রধান সম্পদ তেল হলেও এরা প্রতিবেশী দেশগুলোর মত শুধু তেলের ওপর নির্ভরশীল নয় বলে এটি বিশ্বের অন্যতম একটি ধনী দেশ। সমুদ্র বেষ্টিত দেশ ওমানে তেল, গ্যাস আবিষ্কারের পূর্বে এদেশের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি কাজ ও মৎস্য আহরণ। প্রধান কৃষিপণ্য খেজুর। ওমানের মুদ্রা বিশ্বের অন্যতম একটি দামি একটা মুদ্রা। ওমানের মুদ্রার নাম ওমানি রিয়াল। ওমানি রিয়ালের মান বাংলাদেশী তাকে প্রায় ২২১ টাকা। দেশটির জিডিপি প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং দেশটির মাথাপিছু যায় ২২ হাজার মার্কিন ডলার। আরবি ভাষা ছাড়াও ওমানে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার খুবই প্রচলিত। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ওমানে কোন হোটেল না থাকলেও বর্তমানে এদেশে ১০০টিরও বেশি বিলাসবহুল হোটেল রয়েছে। ওমানের মানুষ খুবই অতিথি পরায়ণ। অতিথিকে খেজুর ও এলাচ দিয়ে তৈরি চা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়.দেশটির সুলতান আরব দেশগুলির মধ্যে বেশিদিন ধরে ক্ষমতায় আছেন। ওমানে বসবাসকারীদের একটি বড় অংশ বিদেশী নাগরিক। বর্তমানে প্রায় ১২ লক্ষ বিদেশী নাগরিক এদেশে বাস করছে। দেশটির উপকূল এলাকার ৫০ মাইলের মধ্যে মরুভূমি বেষ্টিত বালুর ভিতর বিভিন্ন প্রাণীর ফসিল পাওয়া যায়। এদেশের আরবি ঘোড়ার কদর বিষয় জুড়ে। বিশ্বের সবচেয়ে দামি ঘোড়ার জন্ম ওমানেই. এখানে স্থানীয় ৮০ প্রজাতির পাখি ছাড়াও ২০০ অতিথি পাখি রয়েছে।
ওমানের সরকারী নাম “সুলতানাত অফ ওমান”। আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত ছোট্ট একটি দেশ ওমান। ওমানের উত্তর-পশ্চিমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, পশ্চিমে সৌদি আরব এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ইয়েমেনের অবস্থান। দেশটির দক্ষিণ ও পূর্বদিকে রয়েছে আরব সাগর এবং উত্তর-পূর্ব দিকে ওমান উপসাগর।
পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত দেশটি ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওমান তেলসম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ। এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান বিশ্বে ২৫তম। দেশটির অর্থনীতির একটি বড় অংশ আসে পর্যটন থেকে। এ ছাড়াও দেশটি মাছ, খেজুর ও কিছু কৃষি পণ্যও রপ্তানি করে। যদিও তাদের প্রতিবেশী দেশগুলো এখনো প্রধানত তেলের ওপর নির্ভর করেই চলে।


ওমানে জনবসতির ইতিহাস প্রায় ১০০,০০০ বছরের পুরনো। এই অঞ্চল বাইরের শক্তির দ্বারা বারবার প্রভাবিত হয়েছে। বহিরাগত শক্তির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন আরব গোত্র, পর্তুগাল, এবং ব্রিটেন। আফ্রিকার পূর্ব উপকুলের দ্বীপ জাঞ্জিবার একসময় ওমানের নিয়ন্ত্রণে ছিলো, জাঞ্জিবার ছিলো ওমানের একটি উপনিবেশ। ২০১১ সালে ডক্টর বিন জোভান ওমানে শতাধিক পাথরের তৈরী যন্ত্র আবিস্কার করেছিলেন, যা সনাতন নুবিয়ান কমপ্লেক্সের বৈশিষ্ট্যবাহী। পূর্বে এই ধরনের নমুনা শুধুমাত্র সুদানে পাওয়া গিয়েছিলো। দুইটি আলোক বিকিরণের দ্বারা আরবিয় নুবিয়ান কমপ্লেক্সের বয়স হিসাব করা হয়েছে প্রায় ১০৬,০০০ বছর। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে দক্ষিণ আরবে একটি স্বতন্ত্র গতিশীল প্রস্তরযুগীয় প্রযুক্তি ব্যাবস্থার বিকাশ হয়েছিলো, যা মেরিন আইসোটপের পঞ্চম পর্যায়ের প্রথম দিকের নিদর্শন।
প্রত্নতত্ত্ববিদরা দোফার পর্বতে খননকার্যে ব্যস্ত। তারা মধ্যবর্তী প্রস্তর যুগীয় নিদর্শন পেয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, আফ্রিকা থেকে মানবজাতির পুরো বিশ্ব ছড়িয়ে যাওয়ার জন্য তাদের বাব-আল-মান্দাবের বাঁধা অতিক্রম করতে হয়েছিলো। সবুজ উপকূল বরাবর হেটে তারা আরব ও তারপর ইউরেশিয়ায় প্রবেশ করেছিলো। এটা সম্ভব হয়ে উঠবে যদি তখন ইয়েমেন ও দক্ষিণ ইরিত্রিয়ার মধ্যবর্তী সমুদ্র স্তর প্রায় ৮০ মিটার পর্যন্ত নীচে নেমে গিয়ে থাকে। একটি স্তর ছিল যে সময় পৌঁছে একটি হিমবাহের ংঃধফরধষ ৬০ থেকে ৭০ কা হিসেবে জলবায়ু ঠান্ডা বৎৎধঃরপধষষু পৌঁছানোর শেষ হিমবাহের সর্বোচ্চ. থেকে ১৩৫,০০০ ৯০,০০০ বছর আগে, ক্রান্তীয় আফ্রিকা ছিল সবমধফৎড়ঁমযঃং যা ঘটেছে, মানুষের কাছ থেকে জমি এবং সমুদ্রের দিকে, এবং তাদের বাধ্য করতে পার থেকে অন্য মহাদেশে.গবেষকরা ব্যবহার রেডিওকার্বন ডেটিং কৌশল পরাগ শস্য আটকে লেক-নীচে কাদা স্থাপন করার গাছপালা বেশি বয়সের মালাউই হ্রদ আফ্রিকা গ্রহণ নমুনা এ ৩০০-বছর-অন্তর. নমুনা এ থেকে সবমধফৎড়ঁমযঃ বার ছিল একটু পরাগ বা কাঠকয়লা পরামর্শ বিক্ষিপ্ত গাছপালা সঙ্গে সামান্য বার্ন করার জন্য. কাছাকাছি এলাকা, লেক মালাউই, আজ ব্যাপকভাবে বনভূমি ছিল একটি মরুভূমি প্রায় ১৩৫,০০০ ৯০,০০০ বছর আগে
ওমানের উত্তরাংশের অর্ধেক (আধুনিক বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বেলুচিস্তান ও পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের পাশে ) সম্ভবতঃ পারস্যের হখামনি সাম্রাজ্যের মাকা সাতরপির অংশ ছিল। মহাবীর আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের শাসনামলে সাতরপির অস্তিত্ব সম্ভবত ছিলো। এর রাজধানী পুরুষ শহরে তাকে অবস্থান করতে বলা হয়েছিলো। ধারণা করা হয় স্থানটি কেরামান প্রদেশের বাম এলাকায় অবস্থিত। ১ম সহস্রাব্দের (ইউঊ) দ্বিতীয় অর্ধাংশ থেকে সেমিটিক ভাষাভাষী মানুষ মধ্য ও পশ্চিম আরবের পূর্ব দিকে গমন করা শুরু করে। এই জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপজাতি আযদ নামে বিখ্যাত। পার্থিয়ান ও সাসানীয় উপকূলে তখন উপনিবেশ বজায় ছিল। ১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সেমিটিক ভাষাভাষীরা ওমানের কেন্দ্রীয় অঞ্চল সামাদ আল-শানে বসবাস করেছে। বর্তমানে এই অঞ্চলের নাম সংযুক্ত আরব আমিরাত। ১৯ শতক পর্যন্ত বেদুঈন আগমের ধারা অব্যাহত ছিলো। তারা এখন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো শাসন করছে।
ওমানে ৬৩০ সালেই ইসলাম প্রবেশ করে। তখন মোহাম্মাদ (সাঃ) জীবিত ছিলেন। ৬৩২ সালে রিদ্দার যুদ্ধ এর মাধ্যমে ওমানের একত্রীকরণ ঘটে। বর্তমানে ওমান হলো পৃথিবীর একমাত্র মুসলিম দেশ যেখানে ইবাদি মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। “মধ্যপন্থী রক্ষণশীলতা”র জন্য ইবাদি মতাদর্শ বিখ্যাত। এই আদর্শের এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো এখানে শাসক পছন্দ করা হয় সাম্প্রদায়িক ঐক্যমত্য এবং সম্মতির দ্বারা। একজন ইমাম বা নেতার কাছে সমস্ত ক্ষমতা অর্পণ করা হয়, ওলামা বা জ্ঞানী ব্যক্তি সেই নেতা নির্বাচন করে থাকেন। একজন ব্যক্তি তখন নেতা হিসেবে চূড়ান্ত হয়ে যান যখন, তিনি উপজাতি নেতাদের বশ্যতা লাভ করেন এবং সাধারণ জনগণের কাছ থেকে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) অর্জন করেন।
বহিরাগত শক্তি বারবার ওমানে আক্রমণ করেছে। ৯৩১ ও ৯৩২ সালে কারমাটিয়ানরা ওমান শাসন করে। এরপর আবার ৯৩৩ ও ৯৩৪ সালে শাসন করে তারা। ৯৬৭ সাল থেকে ১০৫৩ সাল পর্যন্ত ইরানের শাসনে ছিলো। ১০৫৩ সাল থেকে ১১৫৪ সাল পর্যন্ত সেলজুকরা ওমান শাসন করেছে। সেলজুক ক্ষমতা ওমানের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিলো।
১৯৯৬ সালের নভেম্বর মাসে সুলতান কাবুস “রাষ্ট্রের মৌলিক বিধি” উপস্থাপন করেন। এটিই হলো ওমানের প্রথম লিখিত “সংবিধান”। এই সংবিধান ইসলামি আইন ও প্রচলিত আইনের কাঠামোয় বিভিন্ন অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। এই সংবিধানের মাধ্যমে, মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে কোন সরকারী শেয়ারহোল্ডিং সংস্থার কর্মকর্তা হওয়া যাবে না, এই আইনের কারণে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা দ্বন্দ্বের আংশিক সমাধান হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় সফলতা হলো সুলতানের উত্তরাধিকার আইন বিধিবদ্ধ করা।
হরমুজ প্রাণালীর ওপর ওমানের কৌশলগত অবস্থান আছে। যা পারস্য উপসাগরের প্রবেশপ যরথে প্রায় ৩৫ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত।আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ব্যাপারে ওমান সর্বদা সচেতন থাকে। এ অঞ্চলের কাছাকাছি যেকোন আঞ্চলিক উত্তেজনা, ইরাক-ইরান দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক ইসলামের সম্ভাব্য হুমকি ইত্যাদি বিষয়ে ওমানের উদ্বেগ রয়েছে। ইরাকের সাথে ওমান একটি কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলো যখন তারা একই সাথে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় জাতিসংঘ জোটকেও সমর্থন দিচ্ছিলো। তারা উক্ত জোটে সৈন্য পাঠিয়েছিলো এবং তাদের দেশকে অস্ত্র ও রসদ সরবাহের জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলো।
২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওমানের মজলিস আল-শুরার জন্য প্রায় ১ লক্ষ ওমানী নারী ও পুরুষ মিলে দুই জন নারীসহ মোট ৮৩ জন প্রার্থী নির্বাচিত করেন। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে সুলতান কাবুস ৪৮ জনকে মজলিস আল দাউলায় নিযুক্ত করেন। এটা তাদের দেশের রাষ্ট্রীয় পরিষদ। এই পরিষদে পাঁচজন নারী সদস্যও ছিলেন। পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় বিশ্বের অন্যতম সুন্দর এ দেশটিতে রয়েছে দেখারমত অনেককিছু।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *