ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গঠনে মহানবী (সা)

প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী
ইসলাম আল্লাহপ্রদত্ত এক পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। মানুষের জীবনের ব্যাপকতা যতখানি ইসলামও ততখানি বিস্তৃত। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সকল ক্ষেত্রে ইসলামের বক্তব্য সুস্পষ্ট। কোথাও একদেশদর্শিতা নেই। আবার ইসলামে নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, মুসলিম-অমুসলিম সকলের স্বার্থ ও নিরাপত্তা সংরক্ষিত রয়েছে। এক কথায় বলা যায় শ্রেণি, বর্ণ, গোষ্ঠী, ধর্ম নির্বিশেষে সকলের স্বার্থসংরক্ষণকারী একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনাদর্শই হলো ইসলাম। আল্লাহপাক সকলের স্রষ্টা (খালেক), লালন-পালনকারী (রব), শাসক (মালিক) এবং তাকে কেউ মানুক আর না মানুক সকলের প্রয়োজন তিনি পূরণ করে যাচ্ছেন। তাঁর প্রদত্ত বিধানেই সম্ভব সকলের স্বার্থ সংরক্ষণ।
মানুষ আল্লাহ তায়ালার বড় প্রিয়, বড় আদরের সৃষ্টি; সকল সৃষ্টির সেরা তাঁরই প্রতিনিধি। এই পৃথিবীর বুকে সুন্দর জীবন-যাপনের লক্ষ্যে মানুষকে জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন করার পরও আল্লাহপাক তাকে হিদায়াত দান করেছেন। পৃথিবীতে আসার সময়ে আদি পিতা হযরত আদম (আ) ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে অভয়বাণী শোনানো হয়েছিল, ‘আমার পক্ষ থেকে যে হিদায়াত যাবে যারা তা অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয়ের কারণ নেই’। তাঁর প্রতিশ্রুতি মোতাবেক প্রতিটি যুগে প্রতিটি জনপদে অসংখ্য নবী-রাসূল এসেছেন এবং সেই ধারা মোতাবেক সর্বশেষ নবী ও রসুল হলেন আমাদের প্রিয়তম নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম।
মহানবী (সা)-এর আগমনকালকে অন্ধকার যুগ বলা হয়। মানুষ ছিল নানাভাবে বিভক্ত এবং দুর্বলের ওপর ছিল সবলের সীমাহীন অত্যাচার ও জুলুম-নির্যাতন। সম্মান ও মর্যাদাগতভাবে মনিব ও দাস, নারী ও পুরুষ বিভক্ত হওয়ার পাশাপাশি ছিল বংশীয় কৌলীন্য এবং দেশে দেশে হিংসা-বিদ্বেষ ও রাজ্যজয়ের প্রতিযোগিতা। এমনি একটি পরিবেশে তিনি কোনো শ্রেণি বা পেশার মানুষকে উস্কিয়ে না দিয়ে বা সমাজের কোনো সমস্যাকে পুঁজি করে একে অপরের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম না করে সমগ্র মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছিলেন, ‘হে দুনিয়ার মানুষ! তোমরা সকলে মিলে বলো-আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাহলেই তোমরা সফলকাম হবে’। মানবচরিত্রে ভালো বলে স্বীকৃত সকল সৎ গুণাবলীর সমাবেশ ঘটেছিল তাঁর জীবনে এবং নবী হওয়ার পূর্বেই তিনি ছিলেন তাঁর জাতির একজন আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত; তাদের বিবাদ-বিসংবাদের মীমাংসাকারী ও আমানত সংরক্ষণকারী আল-আমিন ও আস-সাদিক। এতো কিছুর পরও তাঁর জাতি এই চিরন্তন সত্য বাণী মেনে নিতে পারলো না এবং প্রচণ্ড বিরোধিতার মধ্য দিয়ে রাসূল (সা)-এর আহ্বানের জবাব দিলো।
বাধা-বিপত্তির মধ্যেও কিছু সংখ্যক সত্যনিষ্ঠ নারী ও পুরুষ, দাস ও মনিব, ধনী ও দরিদ্র ব্যক্তি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম কবুল করেন এবং এক পর্যায়ে আল্লাহপাক তাঁর মাধ্যমে দ্বীনকে বিজয়ী করেন। তিনি সমাজের অবহেলিত অংশ নারী, দাস ও দরিদ্রদের প্রতি সদয় ছিলেন কিন্তু তিনি পুরুষ বিদ্বেষী বা ধনী বিদ্বেষী ছিলেন না বা সমাজে কোনো ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াননি। সমাজে সকল শ্রেণি ও পেশার মধ্যে তিনি ভারসাম্য নিয়ে এসেছেন। তিনি বিলালের মতো দাসের সাথে ওসমান গণির মতো ধনাঢ্য ব্যক্তিকে গভীর ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র বা বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব সব পার্থক্য দূর করে মানবজাতিকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিলেন। বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ, পেশা, বংশভেদে মানুষে মানুষে সকল পার্থক্য অস্বীকার করে তিনি ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের মধ্যে একে অপরের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই বরং ঐ ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ যে আল্লাহকে বেশি ভয় করে বা যে চরিত্রের দিক দিয়ে উত্তম।’
মহানবী (সা) শুধু সমাজেই নয়, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন-যাপনেও মধ্যমপন্থা বা ভারসাম্য বজায় রেখেছেন এবং তাঁর উম্মতকে তাগিদ দিয়েছেন। তিনি ঘর-সংসার করেছেন এবং এ ব্যাপারে তিনি আদৌ উদাসীন ছিলেন না, তাঁর একাধিক স্ত্রী ছিল এবং কারো প্রতি ঝুঁকে পড়ে অপরের অধিকার হরণ করেননি। তিনি ছিলেন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা। বিচার-আচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ সকল কাজে তাঁকেই নেতৃত্ব প্রদান করতে হয়েছে। আবার ইবাদত-বন্দেগির কঠোর শ্রমে নিজেকে নিয়েজিত রাখতেন। তাহাজ্জুদ নামাজ তাঁর নিজের জন্য ফরজ হিসেবে আদায় করতেন এবং সোমবারসহ মাসে তিন দিন ও নফল রোজা রাখার ক্ষেত্রে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না। দ্বীন ও দুনিয়া তাঁর কাছে আলাদা ছিল না এবং এক অপূর্ব সমন্বয় ছিল তাঁর জীবনে। তিনি শুধু নিজেই ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন করেননি, তিনি তাঁর উম্মতদেরও তাগিদ দিয়েছেন। একবার তিন ব্যক্তি তাঁর বিবিদের কাছে রাসূল (সা)-এর জীবনযাপন জানতে চান। শোনার পর তারা পরস্পর বলেন, আল্লাহপাক তাঁর আগের-পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, আমাদের এতোটুক আমল যথেষ্ট হবে না। তারা বলাবলি করছিল, আমি জীবনে বিয়ে-সাদী করবো না এবং সব সময় ইবাদত-বন্দেগিতে নিজেকে নিয়োজিত রাখবো; আর একজন বলেন, আমি সারা বছর রোযা রাখবো। রসুল (সা) ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলেন, আমি তোমাদের অপেক্ষা আল্লাহকে অধিক ভয় করি, আমি বিয়ে-সাদী করেছি, সন্তানাদি আছে, নামাজ পড়ি আবার ঘুমাই এবং রোযা রাখি ও ভাঙ্গি; এটিই আমার সুন্নাত, এর বাইরে যে জীবন তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সকল ক্ষেত্রে মহানবী (সা)-এর জীবন ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। তাঁর খানা-পিনা, পরিচ্ছন্নতা, স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে ব্যবহার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় দায়-দায়িত্ব পালনে কখনো কোনো অবহেলা বা বিশেষ ব্যাপারে ঝুঁকে পড়েননি। সকলের অধিকার আদায়ে ছিলেন যত্নশীল। আল্লাহর হক ও বান্দার হক পালনে কখনই কোন শৈথিল্য প্রদর্শন করেননি। ইসলাম পূর্ণাঙ্গ দ্বীন এবং সেই দ্বীনের রূপকার ছিলেন প্রিয়তম নবী মুহাম্মদ (সা)। তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির আদর্শ। একজন আদর্শ স্বামী ও গৃহকর্তা, আদর্শ পিতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধার। সকল শ্রেণি পেশা ও বয়সভেদে তিনি সবারই আদর্শ এবং সবারই অনুপ্রেরণা।
মহানবী (সা) ছিলেন অত্যন্ত কর্মব্যস্ত মানুষ। তিনি কতোটা কর্মব্যস্ত তা আমরা কল্পনাও করতে পারবো না। শত কর্মব্যস্তার মাঝে নামাজই ছিল তাঁর কাছে প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে ইমাম হিসেবে আদায় করেছেন। জামায়াতের ব্যাপারে তিনি তাঁর সাহাবিদের মাঝে কোনো শৈথিল্য মেনে নেননি। এমন কী উম্মে মাকতুম (রা)-এর মতো অন্ধ সাহাবিকেও ছাড় দেননি। আল্লাহপাক বলেছেন, রসুলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। ব্যস্ততার অজুহাত তুলে জামায়াত ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এশার নামাজ শেষে তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন। রাত্রিটা ছিল তাঁর বিশ্রাম, স্ত্রীদের সাথে সময়দান ও আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছার মাধ্যম আর দিন ছিল কর্মব্যস্ততার। তাঁর অনুসারীদের জন্য এটিই সুন্নত।
রাসূল (সা)-এর সমগ্র জীবন তাঁর উম্মতদের জন্য অনুসরণীয় এবং তাঁর মাধ্যমে আল্লাহপাক তাঁর দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দান করেছেন। আল্লাহপাক মানার ক্ষেত্রে তাঁর বান্দাদের জন্য দ্বীন সহজ করে দিয়েছেন। তাঁর বাণী, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাননি’। রাসূল (সা) তাঁর উম্মতদেরকে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন। বাড়াবড়ি তিনি অপছন্দ করতেন। হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকার আহবান জানিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘আগুন যেমন শুকনা কাঠকে নিমেষেই ধ্বংস করে দেয়, তেমনি হিংসা মানুষের নেক আমল ধ্বংস করে দেয়’। হিংসা-বিদ্বেষের কারণেই সমাজে যত অশান্তি ও হানাহানি। রাসূল (সা)-এর হাতে গড়া সমাজে সকল মানুষের সহাবস্থান ছিল এবং সেই সমাজ ছিল শান্তি ও নিরাপত্তার। তাঁর সমাজে কেউ অপরাধ করলে তার সামাজিক পরিচিতি বা মর্যাদা বিবেচনা করা হতো না এবং এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট-‘আমার মেয়ে ফাতিমাও যদি চুরির অপরাধে অপরাধী হন, তাহলে আমি তার হাত কেটে দিব’। আইনের শাসন বলতে যা বোঝায় জগৎবাসী রাসূল (সা)-এর প্রতিষ্ঠিত সমাজে সেটিই প্রথম লক্ষ্য করেছে। পরবর্তীতে খলিফা ওমর (রা) তাঁর ছেলেকে শাস্তিদানের ক্ষেত্রে একটুও কুণ্ঠা প্রকাশ করেননি। আবার আলী (রা) তাঁর বর্মচুরির ঘটনায় কাজীর দরবারে এক ইহুদির বিরুদ্ধে মামলা রুজু করলে কাজী গ্রহণযোগ্য সাক্ষী না থাকায় ইহুদির পক্ষে রায় দেন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও কল্যাণকর এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা বিশ্ববাসীর কাছে প্রথম উপস্থাপন করেন মুহাম্মদ (সা)।
লেখক : উপাধ্যক্ষ (অব), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *